দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশে নভেল করোনা ভাইরাসের তান্ডব চলছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে করোনা পরিস্তিতি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী করোনা সং/ক্র/ম/ণ কিছুটা কমেছে। তবে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃ"ত্যুর পরিসংখ্যান এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। এরই মধ্যে হার্ড ইমিউনিটি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। এক্ষেত্রে এক নতুন দুশ্চিন্তায় পড়েছে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
সরকারি হিসাবে দেশে করোনা সং/ক্র/ম/ণ এখন কমতির দিকে। নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার কমছে। যদিও মৃ/ত্যু/র পরিসংখ্যান এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়েই আছে। এমন অবস্থায় হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। শুরু থেকেই বলা হচ্ছিল হার্ড ইমিউনিটি অর্জন হলে একপর্যায়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। তবে এই চিন্তায় বড় বিপত্তি হয়ে এসেছে দ্বিতীয় দফায় সং/ক্র/ম/ণ। অনেকে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হওয়ার পর আবারো আক্রান্ত হচ্ছেন। এতে চিন্তিত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন- এমন অবস্থায় হার্ড ইমিউনিটির চিন্তা অমূলক। কারণ দেশে এখন পর্যন্ত করোনার নমুনা পরীক্ষাই সন্তোষজনক অবস্থায় নেই। তাই প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা জানা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের বিষয়টি কিভাবে বিবেচ্য হবে। এ ছাড়া এ নিয়ে পৃথক কোনো গবেষণাও নেই। তাই হার্ড ইমিউনিটি অর্জন হয়ে গেছে বা হবে এমনটি ভাবাও ঠিক হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

করোনা প্রতিরোধে বাংলাদেশে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হওয়াকে কীভাবে দেখছেন জানতে চাইলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া) সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, আমাদের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষের মধ্যে যদি করোনা সং/ক্র/মি/ত হয়ে যায় তাহলে দেশের অধিকাংশের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হয়ে যায়। এ হিসাবে বাংলাদেশে কমপক্ষে ১২ কোটি লোকের করোনা সং/ক্র/ম/ণ হতে হবে। সুতরাং হার্ড ইমিউনিটি হওয়া এটা চিন্তা করাই বোকামি। এটা অসম্ভব। যদি হয় তাহলে লাখ লাখ মানুষ মারা যাবে। ১২ কোটি লোকের করোনা সং/ক্র/ম/ণ হলে আমাদের যে স্বাস্থ্যসেবা আছে তা দিয়ে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব নয়। কী কৌশলে করোনার বর্তমান অবস্থা থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় তা নিয়ে সরকার এবং বিশেষজ্ঞদের চিন্তা করা উচিত বলে এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মনে করেন। তিনি বলেন, সঠিক পরিকল্পনা করে তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

এ বিষয়ে জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সদস্য, দেশের বিশিষ্ট ভাইরোলজিস্ট এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, দেশে মানুষের মধ্যে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়েছে এটা বলার কোনো গবেষণা হয়নি। অ্যান্টিবডি টেস্ট হয়নি। জরিপে বস্তিতে কম সং/ক্র/ম/ণ হয়েছে সেই প্রসঙ্গ টেনে এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, বস্তিতে হয়তো অন্যান্য ভাইরাস রয়েছে, এজন্য করোনা ভাইরাসটি সেখানে কম সং/ক্র/মি/ত হয়েছে। এটা একটা সম্ভাবনা। হার্ড ইমিউনিটি বলতে হলে অবশ্যই গবেষণা লাগবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডবিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক ড. পুনম ক্ষেত্রপাল সিং বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে বলেছেন, কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে সাড়া দেয়ার ক্ষেত্রে ডব্লিউএইচও স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে। এর মধ্যে ভাইরাসে মানুষের মৃ/ত্যু/র বিষয়টি নথিবদ্ধ করার কাজও অন্তর্ভুক্ত আছে। এখানে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়েছে এটি বলার মতো প্রাসঙ্গিক তথ্যসহ কোনো প্রযুক্তিগত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে গোষ্ঠী সং/ক্র/ম/ণ পর্যায়ে রয়েছে। যার অর্থ হলো ভাইরাসটি এমনভাবে ছড়াচ্ছে যে সব ক্ষেত্রে সং/ক্র/ম/ণে/র উৎস জানা সম্ভব হচ্ছে না। এরপরও বাংলাদেশ সরকারের সমন্বয়, আগেভাগে রোগ শনাক্তকরণ, স্বাস্থ্যগত ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পদক্ষেপ সুফল দিয়েছে। এসব পদক্ষেপ সং/ক্র/ম/ণ ছড়িয়ে পড়ার হার এবং চিকিৎসা সহায়তা প্রয়োজন এমন নতুন সং/ক্র/মি/ত রোগীর সংখ্যা এমনভাবে সীমিত রাখতে সহায়ক হয়েছে যে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ অনেক বেশি বেড়ে যায়নি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ কী কী পদক্ষেপ নিতে পারে? এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের উচিত হবে রোগ প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে যে মিশ্র পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তা চালু রাখা। একইসঙ্গে কোভিড-১৯ রোগে যারা আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা সরবরাহের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। যেহেতু কড়াকড়ি তুলে দেয়া হচ্ছে, সেহেতু মানুষের এটি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ যে ভাইরাস এখনো স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর আছে। এ কারণে পর্যাপ্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং এর নিয়মিত পর্যালোচনা জারি রাখা প্রয়োজন। যেমন মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও নিয়মিত হাত ধোয়ার বিষয়গুলো সম্পর্কে সতর্ক থাকা দরকার।

প্রসঙ্গত, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করোনা ভাইরাস বিষয়ে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দেশে এখন পর্যন্ত এই প্রাননাশকারী করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৩,৩৭,৫২০ জন দাঁড়িয়েছে। এবং মৃ"তবরনের সংখ্যা ৪,৭৩৩ জন। তবে এই ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করে দেশের অসংখ্য মানুষ সুস্থতা লাভ করতেও সক্ষম হয়েছে।