ঢাকা, ২৪ জানুয়ারি- ঢাকা কাস্টমস হাউসে অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে বিভিন্ন সময় জব্দ করা ৩৮টি গাড়ি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) গাফিলতি ও নজরদারি না থাকায় কোটি কোটি টাকা দামের বিলাসবহুল এ সব গাড়ি নষ্ট হচ্ছে।
শুল্ক ফাঁকি, মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে আমদানি, কারনেট ডি প্যাসেজ সুবিধা, ডিপ্লোম্যাটিক ও প্রিভিলেজ সুবিধার অপব্যবহার করে আমদানির অভিযোগ থাকায় শুল্ক গোয়েন্দারা গাড়িগুলো জব্দ করেছিলেন।
কাস্টমস সূত্রে জানা যায়, সাধারণত কাস্টমস আইন ১৯৬৯ এর ধারা ২ এর এফএস ও ধারা ১৫ ও ১৬ লঙ্ঘন হলে শুল্ক গোয়েন্দা বিলাসবহুল এ সব গাড়ি জব্দ করে থাকেন। আর কাস্টমস আইনের ধারা ১৫৬ অনুযায়ী বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করে কাস্টমস হাউসগুলো।
ঢাকা কাস্টমস হাউসে শুল্ক গোয়েন্দাদের আটক করা বিএমডাব্লিউ, রেঞ্জ রোভার, পোরশে, পাজেরো, টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার, ল্যান্ড রোভার ও মার্সিডিজ এর মতো দামি গাড়ি রয়েছে। কিন্তু গাড়িগুলো শুল্ক গোয়েন্দা হস্তান্তর করার পর ঢাকা কাস্টমস হাউসের নির্দিষ্ট কোনো শেড বা অবকাঠামো না থাকায় কাস্টমস ভবনের পেছনের মসজিদের পাশে খোলা আকাশের নিচে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে জব্দ গাড়িগুলোর মামলা নিষ্পত্তি করতেও বছরের পর বছর পেরিয়ে যায়। আবার অনেক সময় মালিকানা না থাকায় গাড়িগুলো নিষ্পত্তি করতেও সমস্যায় পড়তে হয়।
এদিকে সরেজমিনে ঢাকা কাস্টমস হাউসে গিয়ে দেখা যায়, উন্মক্ত স্থানে রোদ ও বৃষ্টিতে গাড়িগুলো রাখায় অনেক গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে। এমনকি যেখানে গাড়িগুলো রাখা হয়েছে সেখানে বৃষ্টির পানি জমে যাওয়ায় গাড়িগুলো ক্রমশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আবার গাড়িগুলোর কোনো সিকিউরিটি ব্যবস্থা না থাকায় অনেক গাড়ির যন্ত্রাংশ চুরিও হয়ে গেছে।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, জব্দকৃত অধিকাংশ গাড়ি শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা। আর এই অপব্যবহারকারীদের বেশির ভাগ হচ্ছে বিদেশি নাগরিক। তাদের কেউ কেউ বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), মার্কিন সাহায্য সংস্থা ইউএসএআইডি, ব্রিটিশ সাহায্য সংস্থা ডিএফআইডি, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা-জাইকা, ইউনিসেফ ও ইউএনডিপির মতো প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে কর্মরত ছিলেন। যারা কিনা দায়িত্ব শেষে গাড়িগুলো এনবিআরকে বুঝিয়ে না দিয়ে অন্য জায়গায় বিক্রি করার মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা কাস্টমস হাউসের এক কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে  বলেন, ’ঢাকা কাস্টমসের পুরো জায়গাটি হচ্ছে সিভিল অ্যাভিয়েশনের।’
ঢাকা কাস্টমসে গাড়ি রাখার কোনো শেড (নির্ধারিত গুদাম) নেই। এনবিআর যদি কোনো শেড বা গাড়ি রাখার অবকাঠামো করে দিতে পারে তাহলে জব্দ হওয়া বিলাসবহুল গাড়িগুলো আর নষ্ট হবে না। তবে অবাক করার বিষয় হচ্ছে, গাড়িগুলো সুরক্ষিতভাবে রাখতে নির্ধারিত গুদাম নির্মাণে (শেড) এনবিআরের সঙ্গে ঢাকা কাস্টমসের বিগত দুই কমিশনার লুৎফর রহমান ও প্রকাশ দেওয়ান (বর্তমানে দুই জনই এনবিআরের মেম্বার) আলোচনা করলেও কোনো সুফল মেলেনি। আর কাস্টমস হাউসে রাখা গাড়িগুলো ২০০০ সালের আগের ও পরের সিরিয়ালের। ফলে নিলামে তোলা হলেও বর্তমানে পর্যাপ্ত রাজস্ব পাওয়া যাবে কিনা সেটা নিয়েও সংশয়ে রয়েছেন কাস্টমস কর্মকর্তারা।
ঢাকা কাস্টমস হাউসের কমিশনার আব্দুল মান্নান শিকদার এ প্রতিবেদককে বলেন, ’জব্দকৃত গাড়িগুলো প্রথম নিলামে গাড়ির প্রকৃত মূল্যের ৬০ শতাংশ ও দ্বিতীয়বার নিলামে প্রথমবারের চেয়ে মূল্য বেশি হলে গাড়ি বিক্রির অনুমোদন দেয় কাস্টমস। তবে তৃতীয়বার যেকোনো মূল্যে কাস্টমস গাড়ি বিক্রি করতে পারে। তবে দীর্ঘদিন ধরে কাস্টমসের নিলাম ঘিরে সক্রিয় রয়েছে বেশ ক’টি সিন্ডিকেট। দর নিয়ে এসব সিন্ডিকেটের কারসাজির কারণে যথাসময়ে অনেক নিলামই সম্পন্ন করা যায় না। এছাড়া মামলা চলমান বা নিলাম প্রক্রিয়ায় অনেক কাজ সম্পন্ন করতেই কয়েক বছর পেরিয়ে যায়। ফলে একদিকে যেমন জব্দকৃত গাড়িগুলো থেকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে অন্যদিকে গাড়িগুলো বিক্রি না হওয়া ও মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় গাড়িগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
গাড়িগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এক্ষেত্রে কাস্টমসের কী কিছুই করার নেই এমন প্রশ্নে মান্নান সিকদার বলেন,’গাড়িগুলো রাখতে আলাদা শেডের (নির্ধারিত গুদাম) প্রয়োজন। আর এই শেড বানাতে এনবিআর এর সঙ্গে বিগত কমিশনারদের আলোচনাও হয়েছে। আমি নিজেও আলোচনা করেছি কিন্তু সুফল পাচ্ছি না। ফলে আমি রক্ষণাবেক্ষণের চেষ্টা করলেও সেটা সম্ভব হচ্ছে না। এখানে এনবিআর যদি এগিয়ে না আসে তাহলে আমার পক্ষে কিছুই করা সম্ভব না।’
এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া এ প্রতিবেদককে বলেন, ’অধিকাংশ গাড়ির মামলা চলমান রয়েছে। এছাড়া নিলাম প্রক্রিয়াও অনেক কঠিন। এখানে যেমন মামলা শেষ করতে সময় লাগছে তেমনিভাবে নিলাম নিয়ে নানা সমস্যা আছে। সবমিলিয়ে এনবিআর চাইলেও দ্রুত গাড়িগুলো নিলামে তুলতে পারে না। ফলে গাড়িগুলো নষ্ট হলেও এনবিআরের কিছুই করার থাকছে না।’