প্রাননাশকারী নভেল করোনা ভাইরাসের প্রবল হানা থেকে বাদ যায়নি বিশ্বের অধিকাংশ দেশই। এমনকি গোটা বিশ্বের প্রায় ২১৩টি দেশ ও অঞ্বলে ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে ভাইরাসটি। এবং দেশ ও মানুষ ভেদে ভিন্ন ভিন্ন আচারন করছে ভাইরাসটি। বাংলাদেশেও দেখা দিয়েছে ভাইরাসটি। তবে গবেষকরা এক বার্তা দিয়ে জানিয়েছে ইউরোপ ও এশিয়া মহাদেশের দেশ গুলোর করোনা ভাইরাসের জ্বীনগত ভিন্নতা রয়েছে। বাংলাদেশে দীর্ঘ ছয় মাস ধরে তীব্র তান্ডব চলছে এই ভাইরাসের। এই দীর্ঘ সময়ে করোনা প্রসঙ্গে বাংলাদেশের পরিস্তিতি নিয়ে এক বার্তা প্রদান করেছে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের ছয় মাস পার করছে বাংলাদেশ। প্রথম শ/না/ক্তের ১৮০তম দিনে এসেও বাংলাদেশ অবৈজ্ঞানিক ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে সেরো সার্ভিলেন্স (করোনা সমীক্ষা), অঞ্চলভেদে করোনা পরীক্ষার চিরুনী অভিযানসহ তৃণমূল পর্যায়ে বিনিয়োগ করতে পারলে অনেকাংশেই করোনা প্রতিরোধ সম্ভব হবে। দেশে করোনা ভাইরাস সং/ক্র/ম/ণে/র ২৫তম সপ্তাহ শেষ হয়েছে গত শনিবার। আশার কথা এই সপ্তাহে নতুন রোগী ও পরীক্ষার তুলনায় শ/না/ক্তের হার কমেছে। গেলো সপ্তাহে নতুন রোগী শ/না/ক্ত হয়েছে ১৬ হাজার ৩০০ জন। তার আগের সপ্তাহেও এই সংখ্যা ছিল ১৮ হাজার ১০০। আবার সং/ক্র/ম/ণে/র ২৫তম সপ্তাহে পরীক্ষার বিপরীতে সং/ক্র/মণ শ/না/ক্তে/র হার ছিল ১৭.৩৪ শতাংশ। এই প্রথম টানা ১২ সপ্তাহ পর এক সপ্তাহে শ/না/ক্তের হার ২০ শতাংশের নিচে ছিল।

করোনার ছয় মাসেও সামগ্রিক অবস্থা সম্পর্কে কারও ধারণা নেই
বর্তমানে দেশে করোনা ভাইরাসের পরিস্থিতি কী? জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, "দেশের করোনার সামগ্রিক অবস্থা সম্পর্কে কারো পুরো ধারণা নেই। কারণ দেশে যে পরিমাণ জনসংখ্যা, যে পরিমাণ রোগ শ/না/ক্ত হয়েছে, পুরো বিস্তৃতি, গভীরতা, ধরণ, এবং দেশের কোন অঞ্চলে কম, কোন অঞ্চলে বেশি বুঝতে গেলে যতো পরীক্ষা হওয়া দরকার, সেটা হয় নাই। দেশব্যাপী করোনা জরিপ কোথাও করা হয়নি। ফলে করোনা আছে বা নাই এ ব্যাপারে সঠিকভাবে ধারণা দেওয়া সম্ভব না।’’ ’’এর মাঝেও আমরা দেখতে পাচ্ছি বেশ কিছু মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে এবং হাসপাতালে রোগী আছে। জনসাধারণের মধ্যে ভ/য় নাই, তারা স্বাস্থ্যবিধি মানছেও না। একটা অবৈজ্ঞানিক ব্যবস্থার মধ্যে আমরা রয়েছি।’’ তিনি বলেন, বিজ্ঞানভিত্তিক অবস্থা হচ্ছে সঠিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা রাখা, ধারণা পরিষ্কার রাখা, ডাটা ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত জানা– সেটা আমাদের নাই। করোনা বাস্তবতার নীরিখে কি কৌশল গ্রহণ করব সেটাও ঠিক করা হয়নি।

ডা. লেলিন চৌধুরীর সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মোশতাক হোসেন বলেন, জুন-জুলাই-আগস্ট মাসে শনাক্তের শতকরা হার ছিল ২০ শতাংশের ওপরে, গত দুই সপ্তাহ ধরে এটা ২০ শতাংশের নীচে আছে। ’’বলা যাবে না যে কমেছে, আগামী সময়গুলোতে যদি কমে আসে তাহলে সেটা বলা যাবে। যেমন ঈদুল আযহার আগে কমেছিল, আবার ঈদের পর বেড়েছিল, বর্তমানে দুই সপ্তাহ ধরে ধীরে ধীরে কমছে।’’
ঈদুল আযহার সময় সং/ক্র/ম/ণ বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞদের আ/শ/ঙ্কা সত্য করে ঈদের পরের সপ্তাহগুলোতে সং/ক্র/ম/ণ হার বেড়েছিল। এক পর্যায়ে মৃ/ত্যু বাড়বে বলে তাদের সতর্কতার প্রমাণ দেখা গেল গত সপ্তাহে। শনিবার পর্যন্ত এক সপ্তাহে মৃ/ত্যু হয়েছে ২৯৯ জনের।

করোনা প্রতিরোধে চাই তৃণমূলে বিনিয়োগ
দেশে এখন করোনা প্রতিরোধ করতে হলে তৃণমূল পর্যায়ে বিনিয়োগ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মোশতাক হোসেন। তিনি বলেন, ’শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ করে বা প্রচার প্রচারণা চালিয়ে করোনা প্রতিরোধ করা যাবে না। এখন জনগণকে সম্পৃক্ত করে সরকারী উদ্যোগে আমাদের তৃণমূল পর্যায়ে বিনিয়োগ করতে হবে।’ ’’সরকারকে জনগণকে নিয়ে সক্রিয়ভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবার নির্দেশ দিতে হবে। রোগী শনাক্ত করতে হবে, শনাক্ত রোগীকে আইসোলেট করা দরকার, যারা রোগীর সঙ্গে বেশী ঘনিষ্ঠ হবে তাদের কোয়ারেন্টাইন করতে হবে।’’ ’’সর্বোপরি জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে, করোনার শুরুতে যেটা তাদের করতে হয়নি। কিন্তু এখন জনগণ জীবিকার জন্য বের হয়। তাই তাদের সরকারী উদ্যোগে স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যবস্থা করতে হবে।’’

দেশে চাই সেরো সার্ভিলেন্স
ডা. লেলিন চৌধুরীর মতে দেশে করোনাভাইরাস কী পরিমাণে আছে, তার ব্যাপকতা কতটা, এটা বোঝার জন্য সারা দেশে দ্রুত একটা সেরো সার্ভিলেন্স (করোনা সমীক্ষা) করার প্রয়োজন। ’’সে অনুযায়ী যে অঞ্চলে করোনার সংক্রমণ বেশী সে অঞ্চলগুলোতে জোর দিতে হবে। কিছু জায়গায় চিরুনি অভিযানের মতো পরীক্ষা করতে পারি। অন্যদিকে জাতীয়ভাবে করোনা পরীক্ষা করানোর জন্য জাতীয়ভাবে টেস্ট করাতে হবে,’’ যোগ করেন তিনি।

’’এছাড়াও স্বাস্থ্যবিধি মানা, মাস্ক ব্যবহার করা জনসাধারণকে উৎসাহিত করার জন্য একটা জাতীয় কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। একই সাথে যদি কেউ এটি মেনে না চলে তাহলে শাস্তির ব্যবস্থা করে সেটা মানুষকে জানানো এবং কি শাস্তি দেওয়া হবে সেটার উদাহরণও দিতে হবে,’’ বলেন লেলিন চৌধুরী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন প্রতিদিন কমপক্ষে ২০ হাজার মানুষের পরীক্ষা করে শনাক্তের হার ৫ শতাংশের নীচে নেমে এলে বলা যাবে, করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে দেশে এখন পর্যন্ত ১৫ লাখ ৭৭ হাজার ৬১৬টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। দেশে মোট আক্রান্ত শনাক্ত ৩ লাখ ১৭ হাজার ৫২৮ জন। মোট পরীক্ষার বিপরীতে সং/ক্র/ম/ণ শ/না/ক্তে/র হার ২০.১৩ শতাংশ। দেশে করোনা ভাইরাসে মৃ/তে/র সংখ্যা ৪ হাজার ৩৫১, শনাক্ত বিবেচনায় মৃ/ত্যু হার ১.৩৭ শতাংশ। সবমিলিয়ে সুস্থ হওয়ার সংখ্যা ২ লাখ ১১ হাজার ১৬। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৬৬.৪৬ শতাংশ।

প্রসঙ্গত, দেশে ৮ই মার্চ সর্বপ্রথম দেখা মিলে এই প্রাননাশকারী কোভিড১৯ ভাইরাসের। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত বিদ্যমান রয়েছে ভাইরাসটি। এই ভাইরাস মোকাবিলার জন্য নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহন করেছে সরকার। এবং প্রতিনিয়ত দেশবাসীর উদ্দেশ্যে নানা ধরেনর স্বাস্থ্যমূলক পরামর্শ প্রদান করছে সরকার। দেশে মোট এই প্রাননাশকারী ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩,১৯,৬৮৬ জন। এবং মৃ"ত্যুবরন করেছে ৪,৩৮৩ জন। এবং সুস্থতার সংখ্যা অতিক্রম করেছে ২ লাখের বেশি।