মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হক। একজন সরকারি কর্মকর্তার সকল গুণাবলী সঙ্গেই নিয়েই যেন মাঠে নেমেছেন তিনি। এ উপজেলার যোগদানের পর-পরই নানামূখী কর্মতৎপরতা ও বলিষ্ঠ ভূমিকায় উপজেলায় জুড়ে পরিচিত পেয়েছেন ’জনতার ইউএনও’ হিসেবে। ইতিমধ্যে নানা প্রশংসা কুড়িয়ে পুরস্কৃত হয়েছেন জেলা এবং জাতীয় পর্যায়ে।
ইউএনও মোহাম্মদ মাহমুদুল হক ২০১৬ সালের ৫ মে কমলগঞ্জে যোগদান করেন। যোগদানের পর থেকেই সরকারি দায়িত্বের বাইরেও অনেক সৃজনশীল কাজ করে ইতোমধ্যে সাড়া জাগিয়েছেন জেলা জুড়ে।
উপজেলার মেয়ে শিক্ষার্থীদের বাইসাইকেল প্রদান, দরিদ্র চা জনগোষ্ঠীর সূখ-দুখের ভাগিদার, এলাকাবাসীর সাথে রাস্তা মেরামতে কোদাল হাতে মাটি কাটাসহ অনেক কাজে আলোচনার স্থান করে নিয়েছে তিনি।
এতে অনেকে মনে করেন-নারী শিক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, সাইকেলে প্রদানের একটা ইতিহাস আছে। তখন সদ্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হয়ে কমলগঞ্জে যোগ দিয়েছেন মো. মাহমুদুল হক। একদিন উপজেলার একদম দক্ষিণ সীমান্তের চাম্পারায় চা-বাগান এলাকায় গিয়েছেন। দেখেন অনেক মেয়ে দল বেঁধে হেঁটে যাচ্ছে। তিনি গাড়ি থামিয়ে ছাত্রীদের কাছে জানতে চাইলেন- ’তারা কোথায় পড়ে, বাড়ি কোথায়।’
জানতে পারলেন, তারা পদ্মা মেমোরিয়াল পাবলিক হাইস্কুলে পড়ে। পাঁচ থেকে ছয় কিলোমিটার দূর থেকে হেঁটে তারা স্কুলে আসা-যাওয়া করে। তখনই বাইসাইকেলের বিষয়টি তাঁর মাথায় আসে। তিনি কথা বলেন উপজেলা পরিষদের সব সদস্যের সঙ্গে। সবাই সম্মতি দেন। ৮০টি বাইসাইকেল কেনা হয়। খুঁজে খুঁজে স্কুলের দূরবর্তী ও দরিদ্র পরিবারের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির ছাত্রীদের বাছাই করা হলো। মাস দু-এক আগে এই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় সাইকেল। এরা যত দিন স্কুলে আসা-যাওয়া করবে, এই সাইকেল তাদের। পড়া ছেড়ে দিলে, এসএসসি পাস করলে সাইকেল নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জমা দিয়ে দেবে এটাই শর্ত।
এদিকে উপজেলায় ১৬টি নৃ-গোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায়। ইউএনও মাহমুদুল হক বিশাল চা জনগোষ্ঠীসহ প্রতিটি নৃৃ-গোষ্ঠীর কাছে হয়ে উঠেছেন আপনজন। বৃহৎ চা জনগোষ্ঠীসহ অনেক দরিদ্র গোষ্ঠী থাকার পরেও তার ব্যক্তিগত চেষ্টায় সিলেট বিভাগের ৪৯টি উপজেলার মধ্যে শিক্ষা থেকে পর পর দুই বছর সবচেয় কম ঝরে পড়া উপজেলা নির্বাচিত হয়েছে কমলগঞ্জ। কোনো শিক্ষার্থী লেখাপড়া বাদ দিলে ইউএনও মাহমুদুল হকের কাছে কৈফিয়ত দিতে হয় সোজাসাপটা। সাথে অভিভাকদের ফোন নম্বরে কল দিয়ে রুটিন মাফিক একে একে সন্তানদের লেখাপড়ার খোঁজ-খবর নিচ্ছেন নিত্যদিন।।
বিশেষ খেয়াল রাখেন দরিদ্র শিক্ষার্থীদের। পিছিয়ে থাকা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী অবহেলিত চা শ্রমিকদের উন্নয়ন, নারী উন্নয়ন, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠা, বাল্যবিবাহ রোধ, নারীর ক্ষমতায়ন, নির্যাতিত নারী ও দূরবর্তী নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বাইসাইকেল বিতরণ, ইভটিজিং প্রতিরোধে ভূমিকা রাখাসহ উপজেলার সার্বিক উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন।
শিক্ষার উন্নয়নে অসামান্য ভুমিকা রাখায় জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষা পদকে ভুষিত হন তিনি।
নারী উন্নয়নে নানান ভ’মিকা রাখার জন্য ’জাতীয় পাবলিক সার্ভিস দিবস’ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে তিনি জনপ্রশাসন পদক-২০১৮ গ্রহণ করেন। তবে অন্যরকম খেয়াল রাখছেন ’নারীর ক্ষতায়ন এবং দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য।
সম্প্রতি উপজেলার আমিনা নামের একটি মেধাবী শিক্ষার্থীকে নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে অফিসে ডেকে নিয়ে আমিনার হাতে নগদ ৪ হাজার টাকা তুলে দেন। সাথে আমিনাকে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে উৎসাহ দেন এবং আর্থিক সমস্যার সমাধান করবেন বালে আশ্বস্ত করেন।
অনেক কারণে এখন উপজেলার শিক্ষার্থীদের কাছে প্রিয় নাম মোহাম্মদ মাহমুদুল হক।
অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম হলো, তিনি বিভিন্ন স্কুলের অভিভাবকদের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে লিখে রেখেছেন নিজের ডায়রিতে। অবসর সময়ে সন্ধ্যার পর একেক দিন তিনি একেক শিক্ষার্থীর অভিভাবকের নম্বরে কল দিয়ে কথা বলেন। জানতে চান এই মুর্হূতের আপনার ছেলে-মেয়ে পড়ার টেবিলে আছে কি-না? কথা বলেন, ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গেও। তাদেরকে উৎসাহ দেন লেখাপড়া চালিয়ে যাবার। কখনও কখনও চুপিসারে স্বশরীরে হাজির হন শিক্ষার্থীদের বাড়িতে। নিজের পরিবারের সদ্যসের মতো করে খেয়াল রাখেন উপজেলার ছাত্র-ছাত্রীদের।
এ বিষয়ে মাহমুদুল হক বলেন, কোনো অভিভাবকের নম্বরে কল দিয়ে যদি শিক্ষার্থীদের না পাই তখন বুঝিয়ে বলি লেখাপড়ার গুরুত্ব। কয়েকদিন পর আবারও কল দিয়ে খোঁজ নেই সন্ধ্যার পর সে বা তারা পড়ার টেবিলে আছে কি-না।
পাহাড়ি এলাকার মেয়েদেরকে স্কুলে আসতে হয় ৪ থেকে ৫ কিলোমিটার দুর থেকে। তাই তারা নিয়মিত স্কুলে যাওয়া-আসা করতে পারতো না। এসব মেয়েদের কথা চিন্তা করে ইউএনও মাহমুদুল হক উপজেলার কয়েকটি স্কুলের মেয়েদের মাঝে সাড়ে ৪শ’ বাইসাইকেল বিতরণ করেছেন। ফলে এলাকার মেয়েরা এখন নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে।
উপজেলার তেঁতইগাঁও রশিদ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী বিরাজমনি জানায়, স্কুলে আসতে পাঁচ কিলোমিটার পথের পুরোটাই হাঁটতে হতো। দুর্গম কামার ছড়া চা বাগানের পথে পথে ছিল নানান বিড়ম্বনা। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হতো, ক্লান্ত শরীর নিয়ে পড়ার টেবিলে মনযোগ দেয়া সম্ভব হতো না। এখন নিয়মিত স্কুলে যাই। পথে পথে ইভটিজিংয়েরও ভয় নেই।
উপজেলার আরও কয়েকটি বিদ্যালয়ের অভিভাবকরা জানান-’ ইউএনও স্যার/সাহেব আমাদের সঙ্গে যেমন কথা বলেন, তেমনি আমার ছেলের সঙ্গেও ফোনে কথা বলে। কল করে কোনো সমস্যা আছে কীনা জানতে চান তিনি।’
ইউএনও মাহমুদুল হক একজন সৎ ও প্রগতীশীল চিন্তার মানুষ উল্লেখ করে কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও কেন্দ্রীয় আ’লীগের নির্বাহী কমিটির সদস্য অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন-’নারী শিক্ষার উন্নয়নের জন্য তাঁর অন্যরকম চিন্তা চেতনা ও ভাবনা। অভিভাবকদের সাথে প্রাইভেট যোগাযেগ ও রেজিস্টার মেইনটেইন করা সত্যিই প্রশংসার বিষয়।’
একজন সৎ এবং সৃজনশীল কর্মকর্তা ইউএনও মাহমুদুল হক জানিয়ে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক বলেন- ’তাঁর সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে আমি অভিভূত। একজন সরকারী কর্মকর্তা এমনি হওয়া উচিত। উনার এই ভালো কাজের জন্য ইতোমধ্যে বিভাগীয় এবং জাতীয় পর্যায়ে অনেক পুরস্কারও পেয়েছেন যা আমাদের গর্বের বিষয়।’