বর্তমান সময়ে করোনায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে গোটা বিশ্ব। তবে এই প্রাননাশকারী ভাইরাসে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে ইউরোপ মহাদেশের দেশ গুলো। এবং এই ক্ষতির দিক দিয়ে প্রথম সারির তালিকায় রয়েছে ইতালি। তবে এই সংকটময় পরিস্তিতির মধ্যে দিয়েও ইতালিতে অবস্থানরত অবৈধ অভিবাসীদের বৈধকরণের জন্য এক বিশেষ সুবিধা প্রদান করেছে। এবং বিভিন্ন খাতে কর্মরত অসংখ্য শ্রমিকরা এই সুযোগ পাবে। এরই মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের অসংখ্য শ্রমিকরা।
করোনায় বিপর্যস্ত ইতালিতে অবস্থানরত অবৈধ অভিবাসীদের চলমান বৈধকরণের প্রক্রিয়ায় নিয়মিত কর্মীর স্ট্যাটাস বা বৈধতা পেতে যাচ্ছেন ১৮ হাজার ৩২৪ জন বাংলাদেশি। ১লা জুন থেকে দেশটির সরকার অভিবাসীদের বৈধতা দিতে কৃষি এবং গৃহস্থালি খাতে কর্মরত শ্রমিকদের কাছ থেকে আবেদন গ্রহণ করেছে। ১৫ই আগস্ট অবধি আবেদন গ্রহণের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে উপরোল্লিখিত সংখ্যক বৈধ আবেদন জমা পড়েছে। ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ১৫ই আগস্টের পরিসংখ্যানের বরাতে ইতালির বাংলাদেশ মিশন জানিয়েছে, আবেদনের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে দু’টি ক্যাটাগরিতে ২ লাখ ৭ হাজার ৫৪২টি আবেদন জমা পড়েছে। যার মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকের আবেদন ১৮ হাজারের বেশি। গড়ে বাংলাদেশি আবেদন প্রায় ৯ শতাংশের মতো। গৃহস্থালি কর্ম বা ডমেস্টিক ওয়ার্কারের পদে বেশি বাংলাদেশি আবেদন করেছেন। সেই সংখ্যা ১৬ হাজার ১শ’ ২ জন। আর কৃষিকর্মের জন্য আবেদন করেছেন ২ হাজার ২২২ জন বাংলাদেশি। বাংলাদেশ মিশন ধারণা দিয়েছে, যাচাই-বাছাইয়ে যেসব আবেদন নির্ভুল বা বৈধ বলে বিবেচিত হয়েছে মূলত সেই পরিসংখ্যানই প্রকাশ করেছে ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আশা করা যাচ্ছে, জালিয়াতি বা ডকুমেন্টেশনে কোনো ঝামেলা না হলে প্রায় সব আবেদনকারীই বৈধতা পাবেন।

কোন খাতে কত দেশের নাগরিক বৈধতা পাচ্ছেন?
ইতালিতে কৃষি ও গৃহকাজে নিযুক্তরা বৈধতার আবেদনের সুযোগ পাচ্ছেন। তাছাড়া যারা ইতালির ’স্টে পারমিট’ বা ’পেরমেচ্ছো দ্য সোজর্ন’ নবায়ন করতে পারেননি বা রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে ব্যর্থ হয়েছেন তারাও এই বিশেষ সুযোগের আওতায় নতুনভাবে সাধারণ স্টে পারমিটের জন্য বা নিয়মিত হওয়ার আবেদন করতে পেরেছেন। ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ডাটা মতে, গৃহস্থালি কাজে সর্বোচ্চ আবেদনকারী হচ্ছেন ইউক্রেনের নাগরিকরা। ১৫ই আগস্ট পর্যন্ত ১৮ হাজার ৬৩১ জন ইউক্রেনিয়ান আবেদন করেছেন। এ খাতে শীর্ষ ১০ আবেদনকারীর তালিকায় বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে। তৃতীয় পাকিস্তান, দেশটির ১৫ হাজার ৬১৪ জন নাগরিক ইতালিতে গৃহস্থালি কাজকর্ম করার বিনিময়ে বৈধতা পাচ্ছেন। চতুর্থ অবস্থানে আফ্রিকার একটি দেশ। যার আবেদন পড়েছে ১৫ হাজার ১৮৬টি। পঞ্চম অবস্থানে মরক্কো। দেশটির ১৫ হাজার ৩২৮ জন নাগরিক বৈধতা পেতে যাচ্ছেন। ৬ষ্ঠ অবস্থানে পেরু। দেশটির ১৩ হাজার ৭১১ জন নাগরিক বৈধতা পাচ্ছেন। সপ্তম আলবেনিয়া, দেশটির ১১ হাজার ৬৭১ জন নাগরিকের আবেদন বৈধ হয়েছে। ইতালিতে চীনের ১০ হাজার ৫শ’ ৯, ভারতের ৮ হাজার ৭৩২ এবং মিশরের ৭ হাজার ৮৮৫ জন নাগরিক বৈধতা পাচ্ছেন। এই তালিকায় সুনির্দিষ্টভাবে কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে বলা হয়েছে, গৃহস্থালি কর্ম বা ডমেস্টিক ওয়ার্কার পদে উপরোল্লিখিত ১০ দেশ ছাড়াও বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্রায় ৪৪ হাজার ৪৭১ জন নাগরিক ইতালিতে বৈধতা পেতে যাচ্ছেন।

এদিকে ইতালিতে কৃষিখাতে ৩০ হাজার ৯৯৪ জন বিদেশি শ্রমিক বৈধতা পাচ্ছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষিত তালিকা মতে, এ খাতে ১০ শীর্ষ আবেদনকারীর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। বাংলাদেশের ২২২২ জন নাগরিক কৃষিখাতে বৈধতা পেতে যাচ্ছেন। এ খাতে আবেদনের শীর্ষ অবস্থানে আলবেনিয়া, দেশটির ৫ হাজার ১৭৬ জন নাগরিক বৈধতা পাচ্ছেন। দ্বিতীয় মরক্কো, দেশটির ৪ হাজার ৫৫৬ জন বৈধতার আবেদন করেছেন। তৃতীয় ভারত, দেশটির ৪ হাজার ৪৮৮ জন নাগরিক বৈধতা পেতে যাচ্ছেন। এ তালিকায় চতুর্থ পাকিস্তান, দেশটির ৩ হাজার ৮৪ জন নাগরিক বৈধতা পাচ্ছেন। তাছাড়া তিউনিশিয়ার ১৯শ’ ৩৬ নাগরিক, সেনেগালের ১২শ’ ৬৫ নাগরিক, চীনের ১২শ’ ৩৫ নাগরিক, মিশরের ৯শ’ ৩১ নাগরিক এবং আলজেরিয়া ৮০৮ নাগরিক বৈধতা পাচ্ছেন। এছাড়া উপরোল্লিখিত ১০ দেশের নাগরিক ছাড়াও দুনিয়ার অন্যান্য দেশের ৪ হাজার ৯শ’ ৯৫ জন নাগরিক বৈধতা পেতে যাচ্ছেন।

ইতালি সরকারের ঘোষণা মতে, কৃষিকাজের আওতায় রয়েছে খেত-খামার বা বাগান পরিচর্যা, গবাদিপশু পালন বা এই সংশ্লিষ্ট কাজ, মাছ ধরা বা প্রক্রিয়াজাত করা, কৃষি সরঞ্জাম ও কীটনাশক তৈরি বা সরবরাহের কাজ এবং সবজি, ফল, ফসল প্রক্রিয়াজাত করা। গৃহস্থালি কাজের আওতায় রয়েছে শিশু লালন-পালন, বয়স্কদের সেবা, প্রতিবন্ধীদের দেখভালসহ অন্যান্য গৃহকর্ম। কৃষি ও গৃহকাজের বাইরে যেসব অভিবাসীরা অতীতে বৈধ ছিলেন, অর্থাৎ যাদের স্বল্পমেয়াদি স্টে পারমিট ছিল, কিন্তু নবায়ন করতে পারেননি, তারাও নতুন করে স্টে পারমিটের জন্য আবেদন করেছেন। এ ছাড়া যারা রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছেন বা আবেদন করেছেন, যাদের শিক্ষার জন্য স্টে পারমিট, মানবিক কারণে স্টে পারমিট বা মৌসুমি কাজের জন্য স্বল্পমেয়াদি স্টে পারমিট আছে, তারাও সাধারণ স্টে পারমিটের জন্য আবেদন করতে পেরেছেন।

প্রসঙ্গত, নভেল করোনা ভাইরাসের তান্ডবে বিশ্বের অর্থনীতি বেশ ক্ষতির মুখে পড়েছে। এই করোনায় সৃষ্ট সংকট নিরসনের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহন করেছে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বিভিন্ন দেশের অসংখ্য প্রবাসী শ্রমিকরা বিপদের সম্মুখীন হয়েছে। এমনকি ইতিমধ্যে বিশ্বের বেশ কয়কেটি দেশ প্রবাসী শ্রমিকদের সংখ্যা কমিয়ে আনার জন্য নতুন নীতিমালা ও জারি করেছে। এক্ষেত্রে করোনার সংকটময় পরিস্তিতির মধ্যেও ইতালি সরকার অভিবাসীদের জন্য নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করছে।