বর্তমান বিশ্ব এক ভাইরাস জনিত মহামারির কবলে পড়েছে। এবং এই ভাইরাসটি বৈশ্বিক মহামারির আকার ধারন করেছে। বাংলাদেশেও ব্যপক বিস্তার লাভ করেছে ভাইরাসটি। এই ভাইরাসের প্রকোপে বিশ্ব অর্থনীতি উচ্চ মাত্রায় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বেশ প্রবাভ পড়েছে। এই সংকটময় পরিস্তিতির মধ্যে দিয়েও বাংলাদেশে ব্যপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে ধনী ব্যক্তিদের সংখ্যা। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী এই সংখ্যা উঠে এসেছে প্রকাশ্যে।
করোনা মহামারিকালে যেখানে সাধারণ মানুষের আয় কমে গেছে, সেখানে দেশে নতুন করে কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে গেছে। গত মার্চ থেকে জুন এই তিন মাসে ব্যাংকে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা বেড়েছে ৩ হাজার ৪১২ জন। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, এই বছরের জুন মাস শেষে ব্যাংক খাতে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৬ হাজার ৩৭ জন। গত মার্চ শেষে এই সংখ্যা ছিল ৮২ হাজার ৬২৫ জন। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া ক্যা/সি/নো বিরোধী অভিযানের পর থেকে ব্যাংকে কোটিপতির সংখ্যা কমে যায়। কিন্তু করোনাকালে (চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন) হঠাৎ বেড়ে গেছে এই সংখ্যা। যদিও ২০১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৭৯ হাজার ৮৭৭ জন।

এদিকে জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের সহযোগিতায় প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ আয়োজিত এক ওয়েবিনারে জানানো হয়, করোনার কারণে আয় কমেছে শতকরা ৭২.৬ শতাংশ পরিবারের। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে সেসব পরিবার, যাদের বাৎসরিক আয় ১ লাখ টাকার কম। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত এক বছরে কোটিপতি আমানতকারী বেড়েছে ৫ হাজার ৬৪১ জন। এরমধ্যে করোনাকালেই বেড়েছে ৩ হাজার ৪১২ জন। অর্থাৎ গত বছরের জুন মাস শেষে ব্যাংক খাতে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ৮০ হাজার ৩৯৬ জন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গত ১১ বছর ধরে কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে। ২০০৯ সালের জুন মাস শেষে ব্যাংক খাতে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ৪৯২ জন। এখন এই সংখ্যা ৮৬ হাজার ৩৭ জন। অর্থাৎ গত ১১ বছরে ৬৪ হাজার ৫৪৫ জন মানুষ কোটিপতির তালিকায় নতুন করে নাম লেখিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২০ সালের জুন শেষে ৫০ কোটি টাকার বেশি আমানত রাখা ব্যক্তি রয়েছেন এক হাজার ২৬৯ জন। ৪০ কোটি টাকার বেশি আমানত রাখা ব্যক্তি রয়েছেন ৪১৮ জন। ৩৫ কোটি টাকার বেশি আমানত রেখেছেন ২২৪ জন। ৩০ কোটি টাকারও বেশি আমানত রেখেছেন ৩৮৩ জন। ২৫ কোটি টাকার বেশি আমানত রেখেছেন ৬০৫ জন। ২০ কোটি টাকার বেশি আমানত রেখেছেন ৯৯২ জন। ১৫ কোটি টাকার বেশি আমানত রেখেছেন ১ হাজার ৪৩০ জন। ১০ কোটি টাকার বেশি আমানত রেখেছেন ৩ হাজার ৩০৫ জন। পাঁচ কোটি টাকার বেশি আমানত রেখেছেন ৯ হাজার ৫২৯ জন। এক কোটি থেকে ৫ কোটি টাকা আমানত রাখা ব্যক্তি ৬৭ হাজার ৮৮২ জন। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি ছিলেন মাত্র পাঁচ জন। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বরে এই সংখ্যা বেড়ে ৪৭ জনে দাঁড়ায়। ১৯৮০ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৮ জনে। এরশাদ সরকারের পতনের সময় ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে কোটিপতির সংখ্যা ছিল ৯৪৩ জন। ১৯৯৬ সালের জুনে কোটিপতি ছিলেন দুই হাজার ৫৯৪ জন। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর শেষে এ সংখ্যা দাঁড়ায় পাঁচ হাজার ১৬২ জনে। ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৮৮৭ জনে। ২০০৮ সালে ব্যাংক খাতে কোটিপতি আমানতকারী ছিল ১৯ হাজার ১৬৩ জন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, দেশের কোটি কোটি লোক নিঃস্ব হয়েছে বলেই করোনাকালীন সময়ও সাড়ে তিন হাজার মানুষ নতুন করে কোটিপতি হয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ব্যাংক থেকে লুট করা একটি শ্রেণি কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছেন। আবার তারাই হয়তো ব্যাংকে টাকা রাখছেন। তার মতে, করোনাকালে সাধারণ মানুষের আয় কমেছে। কিন্তু বড় লোক বা ধনীদের আয় বেড়েছে। ব্যাংকে কোটিপতি আমানতকারী বেড়ে যাওয়া তারই প্রমাণ।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের কেন্দ্রয়ী ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের অর্থনীতির সকল ধরনের কার্যক্রম পরিচালান করে থাকে ব্যাংকটি। এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ে দেশের আমানতকারী সংখ্যাও প্রকাশ করে থাকে ব্যাংকটি। এই তথ্য প্রকাশের কোন এখতিয়ার নেই দেশের অন্যান্য ব্যাংক গুলোর। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি তথ্য প্রকাশ করেছে এতে দেশের কোটিপতির সংখ্যা বাড়েছে ৩৪১২ জন।