কোভিড১৯ ভাইরাসকে ঘিরে মানুষের ভীতির শেষ নেই। এই ভাইরাসকে ঘিরে বিশ্ব জুড়ে নানা ধরনের প্রশ্ন উঠছে। এবং বিশ্বের গবেষকরা নানা ধরনের বার্তাও প্রদান করছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মত বাংলাদেশেও এই প্রাননাশকারী ভাইরাসের সং/ক্র/ম/ন অধিক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়েছে। এই ভাইরাস মোকাবিলায় নানা ভাবে কাজ করছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। তবে কোভিড-১৯ ভাইরাসের লক্ষণ শরীরে দেখা দিলেও টেস্ট করার আগ পর্যন্ত জানা সম্ভব হয়না সেই ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত কিনা। এক্ষেত্রে তাদের ১৪ দিনের আইসোলেশনে থাকতে হয়। এই আইসোলেশনে থাকা অবস্থায় করোনা উপসর্গের রোগীদের জন্য সাতটি কাজ করা খুব জরুরি।
দেশে করোনাভাইরাস মহামারি শুরুর পর থেকে প্রতিদিনই আক্রান্তের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি আইসোলেশনে যাওয়ার সংখ্যাও বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব মতে, বাংলাদেশে বর্তমানে করোনা উপসর্গ নিয়ে আইসোলেশনের রয়েছেন ১৬ হাজার ৮৫৬ জন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টাতেই যুক্ত হয়েছেন ৭৯২ জন। কোভিড-১৯ এর লক্ষণ দেখা দিলেও টেস্ট করার আগ পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায় না যে, ওই ব্যক্তি আসলেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কিনা। আবার যারা টেস্ট করার পর পজিটিভ বলে শনাক্ত হন তাদেরও আইসোলেশনে থাকতে হয়। যাতে করে তার মাধ্যমে পরিবারের অন্য কেউ বা অপরিচিত কারো মধ্যেও সং/ক্র/ম/ণ ছড়িয়ে না পড়ে। টেস্টে নেগেটিভ না আসা পর্যন্ত আইসোলেশনেই থাকতে হয় লক্ষণ ও উপসর্গ থাকা রোগীদের। নমুনা পরীক্ষায় পজিটিভ বা নেগেটিভ যাই আসুক না কেন, করোনা সং/ক্র/ম/ণে/র এই সময়টাতে কারো মধ্যে এই রোগটির উপসর্গ থাকলে তার অবশ্যই আইসোলেশনে থাকা উচিত। সং/ক্র/ম/ণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে আইসোলেশনে থাকার বিকল্প নেই। কোভিডের উপসর্গ হিসেবে যদি কারো জ্বর থাকে তাহলে সেটি সেরে যাওয়ার পর, কোন ধরনের ওষুধ সেবন ছাড়া যদি তিনি পরপর তিন দিন সুস্থ বোধ করেন, স্বাভাবিক থাকেন তাহলে ধরে নিতে হবে যে তিনি করোনামুক্ত। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং দেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাইডলাইন অনুযায়ী, যদি তার শারীরিক অন্য কোন সমস্যা না থাকে তাহলে ১৪ দিন পর তাকে করোনামুক্ত হিসেবে গণ্য করা হয়।

আইসোলেশনে থাকা অবস্থায় করোনা উপসর্গের রোগীদের সাতটি কাজ করা খুব জরুরি। নিম্নে এ বিষয়ে আলোচনা করা হলো-

১. পুরো দিনের একটি রুটিন তৈরি করুন
আইসোলেশনে থাকায় আপনার হাতে অফুরন্ত সময়। তাই এই সময় সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে শুরু করে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কী কী করবেন তার একটি রুটিন বা তালিকা তৈরি করুন এবং মেনে চলার চেষ্টা করুন। খাওয়া, ঘুম, শরীর চর্চা, বিনোদনমূলক কাজ কখন কত সময় ধরে করবেন তার আলাদা আলাদা তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। কোন কাজ যেটি এর আগে সময়ের অভাবে করতে পারেননি সেই কাজ আইসোলেশনের সময়টাতে করতে পারেন। যারা ব্যবসা বা চাকরির সাথে জড়িত তাদের এমনিতেও বেশ ব্যস্ত থাকতে হয়। এই সময়ে সেগুলো গুছিয়ে নিতে পারেন। এতে করে তার সময়টা কেটে যাবে, দুশ্চিন্তাও কম থাকবে। তবে আইসোলেশনে থাকা ব্যক্তিকে যিনি দেখা-শুনা করবেন, তার সঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে এবং মাস্ক ব্যবহার করে যোগাযোগ ও কথাবার্তা বলতে হবে।

২. মনোবল শক্ত রাখুন
করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ প্রকাশ পেলে অনেকেই ঘাবড়ে যান। মনোবল হারিয়ে ফেলেন। মানসিকভাবে শক্ত থাকাই এসব লক্ষণ থেকে সেরে ওঠার প্রাথমিক শর্ত। যারা কোভিডের উপসর্গে ভুগছে এবং তার হাসপাতালে যেতে হয়নি বরং বাসায় থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাহলে বুঝতে হবে যে তার সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কারণ তার মধ্যে মৃদু সং/ক্র/ম/ণ হয়েছে। তার সং/ক্র/ম/ণ তীব্র নয়। এসময় মানসিকভাবে শক্ত থাকা বা মন ভাল থাকা মানে হচ্ছে স্ট্রেস হচ্ছে না। তাই স্ট্রেস থেকে মুক্ত থাকা মানে হচ্ছে সুস্থতার দিকে একটা পয়েন্ট এগিয়ে থাকা। করোনায় /মৃ/ত্যু/ হার ১%-এর একটু উপরে। তাই কোভিড হলেই যে কেউ মারা যাবে, সেটি চিন্তা না করে মনোবল দৃঢ় রাখতে হবে।

৩. পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম নিন
করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে এবং শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে ঘুমের বিকল্প নেই। সেক্ষেত্রে আইসোলেশনের থাকার সময় একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষকে ৮ ঘণ্টা ঘুমানো দরকার। সেই সাথে দুপুরে এক ঘণ্টা ঘুমিয়ে নেয়া যেতে পারে। তবে কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার কারণে অনেকেরই শরীর বেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে তার বেশি ঘুমানোর দরকার হতে পারে। বিশেষ করে প্রথম ৬-৭ দিন। তবে আইসোলেশনে যেহেতু একটি ঘরের মধ্যেই বন্দী থাকতে হয়, তাই বিশ্রাম নেয়ার জন্য সারাক্ষণ যাতে বিছানাতেই থাকা না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। আমাদের শরীরে হরমোনাল ব্যালেন্স রক্ষা করার জন্য রাতের ঘুমটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে তো আরো বেশি। আইসোলেশনে থাকার সময় যাদের মনে হয় যে ঘুমের মধ্যে শ্বাস কষ্ট হচ্ছে যার কারণে ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছে। তাহলে এক দিকে বেশিক্ষণ শুয়ে থাকা যাবে না। বার বার ডানে-বামে কাত হয়ে শুতে হবে। মাঝে মাঝে উপুড় হয়েও শুয়ে থাকা ভাল।

৪. পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার খাওয়া
কোভিডে আক্রান্ত হলে সব ধরনের স্বাভাবিক খাবার বেশি বেশি খাবার খেতে হবে। এ সময় পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে যাতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সবল হয়। রোগী যে খাবার খেয়ে উপশম বোধ করে এমন সব খাবার খাওয়া যেতে পারে। গলা ব্যথা বা গলায় খুসখুস করলে, ভারী হয়ে থাকলে বা গলায় কিছু জমে আছে এমন অনুভূতি থাকলে গরম পানি খেলে বা গরম পানি দিয়ে গড়গড়া করলে আরাম বোধ হয়। সেটি করা যেতে পারে।

৫. শারীরিক ব্যায়াম করুন
আইসোলেশনে থাকার সময় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করতে শরীর চর্চা করতে হবে। তবে এ সময় ভারী কোন ব্যায়াম করা যাবে না। শারীরিক অবস্থার সাথে সঙ্গতি রেখে শরীরটাকে সচল রাখার জন্য তাকে হালকা ব্যায়াম করতে হবে। তবে যেহেতু এ সময় জ্বর থাকে তাই ভারী ব্যায়াম এড়িয়ে চলতে হবে। এছাড়া ফুসফুসকে সুস্থ ও সবল রাখতে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়ামও করা যেতে পারে।

৬. রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ পর্যবেক্ষণ
রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেলে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। আর সেটি মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছালে হাসপাতালে ভর্তি করানোর প্রয়োজন হতে পারে। সে কারণে রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ ঠিক আছে কিনা তা পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ বোঝা যায় পালস অক্সিমিটার নামের যন্ত্রের সাহায্যে। সম্ভব হলে এই যন্ত্র সংগ্রহ করে অক্সিজেনের পরিমাণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা যেতে পারে। ৯০ এর উপরে হলে তা খুবই স্বাভাবিক। এর নিচে একবার বা দুই বার নামতে পারে। কিন্তু এটা অব্যাহতভাবে ৯০ এর নিচে থাকলে বুঝতে হবে যে তার রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেছে এবং তাকে তখন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

৭. চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
যেহেতু করোনাভাইরাসের এখনও কোন ধরনের প্রতিষেধক বা ওষুধ নেই, তাই এর চিকিৎসা মূলত হয় উপসর্গ ভিত্তিক। এক্ষেত্রে চিকিৎসকদের পরামর্শ হচ্ছে, যাদের জ্বর রয়েছে তাদেরকে জ্বরের ওষুধ দেয়া যেতে পারে, কাশি থাকলে কাশির ওষুধ। জ্বর বেশি হলে এক সাথে দুটো ওষুধ খাওয়া যেতে পারে। তবে যাদের অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা যেমন ডায়াবেটিক বা উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, বয়স বেশি তাদের ক্ষেত্রে এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। এছাড়া করোনাভাইরাসে জটিলতাগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রক্তে জমাট বেধে যাওয়া। এটি যাতে না হয়, তার জন্য প্রয়োজনে ওষুধ খেতে হবে। আর তা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী।

প্রসঙ্গত, কোভিড১৯ ভাইরাস বৈশ্বিক মহামারির রুপ ধারন করেছে। এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই প্রাননাশকারী ভাইরাসকে বিশ্ব মহামারি হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে। এই ভয়াবহ প্রাননাশকারী ভাইরাসটি বাংলাদেশ সহ বিশ্বের প্রায় ২১৩টি দেশ ও অঞ্বলে ব্যপক হারে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এই ভাইরাস দমনে কোন দেশ এখন পর্যন্ত সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। এক্ষেত্রে গোটা বিশ্ব গবেষকদের এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া নির্দেশনা মেনে এই প্রাননাশকারী ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করছে।