দিলারা জামান বাংলাদেশের বহুল আলোচিত ও জনপ্রিয় সুপরিচিত চেনা মুখ। তিনি একজন অভিনেত্রী। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গনের সাথে কাজ করছেন। তিনি অভিনয় করেছেন অসংখ্য নাটক-সিনেমা। এমনকি কাজ করেছেন অনেক নামি-দামি পরিচালকদের সাথেও। সম্প্রতি তার এই কাজ প্রসঙ্গে বেশ কিছু কথা জানালেন তিনি নিজেই।
৭৯ বছর বয়সে নাটক, সিনেমায় সমানতালে অভিনয় করে যাচ্ছেন কিংবদন্তী অভিনেত্রী দিলারা জামান। সম্প্রতি বদিউল আলম খোকন, সোহেল আরমান, মাবরুর রশিদ বান্নাহর মতো পরিচালকের সঙ্গে সবমিলিয়ে চার-পাঁচটি নাটকে অভিনয় করেছেন। তবে একটির শুটিং এখনও বাকি। দিলারা জামানের সঙ্গে মুঠোফোনে যখন আলাপ হচ্ছিল, তিনি বারবার বলছিলেন- তার নাটকগুলোর মধ্যে মাবরুর রশিদ বান্নাহর ’মায়ের ডাক’ নাটকটি তার সবচেয়ে ব্যতিক্রমী কাজ। ব্যক্তিজীবনের কিছু বিষয় এ নাটকে মিল পেয়েছেন, যা দিলারা জামানকে ভীষণভাবে স্পর্শ করেছে। দিলারা জামানের সঙ্গে মুঠোফোনে আলাপের বিশেষ অংশগুলো তুলে ধরা হলো…

’মায়ের ডাক’ নাটক সম্পর্কে বলুন…

প্রায় ২৫ বছর আমজাদ হোসেনের পরিচালনায় ধানমন্ডিতে একটি প্যাকেজ নাটকের শুটিং করতে গিয়ে দেখেছিলাম ধনী পরিবারে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা আছেন। ভদ্রলোক সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ছিলেন। তার বাড়িতে গাছগাছালিতে ভরা ছিল। কিন্তু ছেলে মেয়েরা সবাই প্রতিষ্ঠিত হয়ে দেশের বাইরে থাকেন। তার বাড়ির একটি অংশ শুটিংয়ে ভাড়া দিতেন। জৈষ্ঠ্য মাস এলে তার নাতিরা দেশে আসতো। অথচ তাদের জীবনে সবকিছু থাকার পরেও কত একা তারা। কি অদ্ভুত লেগেছিল বিষয়টা! মায়ের ডাক করতে গিয়ে আমার সেই স্মৃতিটা বারবার মনে পড়ছিল। আমার দুটো মেয়ে ২০ বছর (কানাডা ও আমেরিকা) দেশের বাইরে থাকে। ওরা ’মায়ের ডাকে’ দেশে আসে। তাদের জন্য আমার সবসময় আকুতি আছে। কাজটি করতে গিয়ে আমার খুব ভালো লেগেছে কাজটি করে। আমার ভিতরে কোথায় যেন নাড়া দিয়েছে। নাটকটের টিমটা খুব ভালো ছিল। এখনকার পরিচিত ছেলে মেয়েরা কাজ করেছে। আমাকে খুব সম্মান দিয়েছে। ভীষণ খুশী হয়েছি।

কুশল বিনিময়ের পরে আপনি বারবার বলছিলেন, ’মায়ের ডাক’ তুলনামূলক অন্যরকম হয়েছে। সেটা কেমন?

নাটকের মধ্যে এখন পরিবার সেভাবে থাকে না। গল্পে বাবা মা থাকলেও খুব কম, পরিবারে কাজের লোক থাকে না। চরিত্রগুলো হাতে গোনা থাকে। প্রধান চরিত্রগুলোতে এতো পরিমাণে পে করতে হয় অন্যদের রাখতে গিয়ে বাজেট সংকটে পড়ে চ্যানেল থেকে অনেক কিছু ধার দেয়া হয়। কিন্তু বান্নাহর মায়ের ডাকে এমনটা দেখিনি। তিন ছেলে ও তাদের নিয়ে পারিবারিক গল্পে পরিচালক একেবারে মন খুলে কাজ করেছে। এতো গোছানো কাজ এখন খুব হয় না বলে আমার ধারণা। নাটকের থিমটা খুবই ভালো। আগেই বলে দিতে চাই না।

তরুণ নির্মাতা বান্নাহর সঙ্গে প্রথম কাজ করলেন। পরিচালক হিসেবে বান্নাহকে কেমন পেয়েছেন?

ওর নাম আমি অনেক শুনেছি। কাজও দেখেছি। আমার অনেক ইচ্ছে ছিল বান্নাহর সঙ্গে কাজ করবো। ইচ্ছে পূরণ হয়েছে। সে অনেক ভালো কাজ করে। খুবই গুছিয়ে করে। অনেক নতুন পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করে দেখেছি তারা হুটহাট সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করে। কিন্তু বান্নাহ ছেলেটা মোটেও তেমন নয়। তার পরিকল্পনা ছকে বাঁধা। আমাকে এতো সম্মান দিয়েছে যা বলে বোঝাতে পারবো না।

তুলনামূলক তারুণ্য, প্রেম-ভালোবাসা, কমেডি নির্ভর নাটক বেশি হচ্ছে। দর্শক পারিবারিক গল্প খুঁজে পাচ্ছে না। এটা কী সময়ের চাহিদা? আপনার মূল্যায়ন কী?

যে জীবন এবং সংস্কৃতি দেখানো হচ্ছে তা আমাদের মূল্যবোধের বাইরে। হয়তো পুরাতন দিনের মানুষ বলেই এটা আমার খারাপ লাগে। সম্প্রতি অনেকগুলো কাজ দেখেছি যেখানে একটি ছেলে ও মেয়ে এক রুমে যা করছে তা দেখানো হচ্ছে। নিশ্চয়ই আমরা বাস্তবে তেমনটা করি না। এগুলো আমাদের সংস্কৃতিকে উজ্জ্বল করে না। এগুলো আমার চোখে খুব লেগেছে।

সিনিয়র শিল্পীদের কেন্দ্র করে কাজ কম হচ্ছে। অথচ, পার্শ্ববর্তী দেশে হরহামেশাই সিনিয়রদের কেন্দ্রে রেখে দুর্দান্তসব কাজ নির্মিত হচ্ছে। দর্শকদের প্রশ্ন, আমাদের এখানে কেন হচ্ছে না? বিষয়টি নিয়ে আপনার আক্ষেপ আছে?

সত্যি কষ্ট হয়। জীবন ও বাস্তবতাকে আমরা অস্বীকার করছি। আমরা চকচকে জিনিস নিয়ে পড়ে আছি। ছাই বা ময়লার মধ্যেও যে ভালো কিছু থাকে সেটা খোঁজার চেষ্টা ও ধৈর্য্য নেই। যারা লেখেন, নাটক পরিচালনা করেন সবাইকে আমি দোষ দেব। একই সাথে চ্যানেলগুলোরও দোষ আছে। তারা বলে দেয়, উমুককে নিতে হবে, উমুককে নেয়া যাবে না। এখনকার নাটকে ভিউয়ের সিস্টেম খুবই খারাপ, শিল্পটাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। আমরা হঠাৎ অল্পকিছু নিয়ে সাময়িক অস্থির থাকছি। রংধনু দেখে ভালো লাগলেও কিছু পরে সেটা আর থাকে না। বিষয়টা তেমনই। জানিনা এই জিনিসগুলো ঠিক হবে কিনা। অনেকেই বলবে, আমি ৭৯ বছরের বুড়ি, কাজে চান্স পাই কম তাই এসব কথা বলছি (হাহাহাহা …)। আসলে তা নয়। তবে তরুণরা প্রেম ভালোবাসা হতাশার গল্পে বেশি কাজ করছে। এগুলোতে সমস্যা আরও ছড়ায়। তাদের বলবো, এগুলোর বাইরে অনেক কিছু আছে তাই নিয়ে কাজ করো।

শেষ প্রশ্ন, গত দুই বছর মহামারী বিরাজমান। অনেকের জীবনযাত্রা পাল্টে গেছে। জীবন সায়হ্নে এসে করোনাকালে আপনার জীবনবোধ বা চিন্তাভাবনা পরিবর্তন এনেছে?

জীবনটা অল্প সময়ের এবং ভালো কিছু কাজ করতে হবে এই বোধ আমার মধ্যে আগের চেয়ে বেশি এসেছে। এই সময়ে মানুষের স্বার্থপরতা দেখেছি। স্নেহ মমতার ত্যাগ দেখেছি। হতে পারে এগুলো সময়ের অভিশাপ নাকি প্রকৃতি প্রদত্ত মায়া নিতে পারিনি বলেই প্রকৃতি আমাদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। পশুর চেয়ে আমরা অধম হয়ে গেছি। মায়া-ভালোবাসার এই জিনিসগুলো আমাকে খুব ভাবিয়েছে।

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের বিনোদন মাধ্যম এক সংকটময় পরিস্তিতির মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। অবশ্যে এমন সংকটময় পরিস্তিতির সৃষ্টরি মূলে বিনোধন অঙ্গনের ব্যক্তিরাই দ্বায়ী। এদিকে সম্প্রতি সময়ে নতুন প্রজন্মের অনেকেই এই মাধ্যমকে দর্শক জনপ্রিয় করে গড়ে তোলার জন্য আপ্রান ভাবে কাজ করছে।