চেম্বারে রোগী দেখছেন এম হাসান আলী খান
ডা. এম হাসান আলী খান। তাকে সবাই চেনেন হাসান ডাক্তার হিসেবে। শহর কিংবা গ্রাম, ছোট থেকে বড় সবার মাঝে পরিচিত একটি নাম। চিকিৎসাসেবায় রয়েছে তার খ্যাতি। গ্রামের পর গ্রাম তিনি ছুটে বেড়াতেন রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিতে। এমন কোনো গ্রাম নেই যেখানে তিনি রোগী দেখতে ছুটে যাননি। চেম্বারে রোগী দেখার পর ডাক পড়লেই তিনি ছুটে যেতেন রোগীর বাড়ি। এখন তার বয়স প্রায় ১০০ ছুঁই ছুঁই। অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে আসেন চেম্বারে। এর পরও শরীরে তার ক্লান্তি নেই। সারাদিন চেম্বারে বসে সেই আগের মতোই রোগী দেখেন তিনি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চেম্বারে বসেই দিন কাটান। কানে কম শোনেন, চোখেও কম দেখেন, কোমর বাঁকা হয়ে গেছে। তবুও চলছে তো চলছেই। টানা ৬২ বছর ধরে তিনি রোগীর সেবা দিয়ে আসছেন। রোগীরাও সেই আগের মতোই তার চেম্বারে ভিড় করছেন।
১৯২৬ সালে ময়মনসিংহ শহরের শানকিপাড়ার এক সল্ফ্ভ্রান্ত পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মীর হোসেন জেলা পরিষদে চাকরি করতেন। তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। সবার বড় এম হাসান আলী খান। তিনি ১৯৪৪ সালে ময়মনসিংহ শহরের মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। এর পর তিনি আনন্দ মোহন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ময়মনসিংহ লিটন মেডিকেল স্কুল থেকে তিনি এলএমএফ পাস করেন। লিটল মেডিকেল স্কুল এখন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিক্ষার্থীদের ছাত্রাবাস হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। এলএমএফ পাস করার পর তিনি সর্বপ্রথম ময়মনসিংহ সূর্যকান্ত হাসপাতালে (বর্তমান কলেরা হাসপাতাল) প্রথম প্যাথলজি বিভাগে চাকরি নেন। চাকরি ভালো লাগেনি বলে তা ছেড়ে তিনি চিকিৎসাসেবায় মনোযোগী হন। এরই মাঝে দেশ স্বাধীনের পর তিনি সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে ১৯৭৪ সালে এমবিবিএস পাস করেন।
১৯৫৬ সালে তিনি বিয়ে করেন মুক্তাগাছার নিমুরিয়া গ্রামে। বিয়ের সুবাদে তিনি বসত গাড়েন মুক্তাগাছায়। স্থানীয় পুরনো বাসস্ট্যান্ড এলাকায় তৎকালীন আজাদ মেডিকেল হলে চেম্বার খুলে রোগী দেখা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে শহরের নাপিতখোলা মোড় এলাকায় নিজস্ব জমিতে বাড়ি নির্মাণ করেন। সেই বাড়িতেই টানা ৬২ বছর ধরে রোগীর সেবা দিয়ে আসছেন। ওই সময় তিনি ছাড়া তেমন উল্লেখযোগ্য চিকিৎসক ছিলেন না। এ কারণে তিনি পুরো মুক্তাগাছায় জনপ্রিয় ওঠেন। গ্রামের মানুষের কাছে ছড়িয়ে পড়ে তার নাম। বড় ধরনের কোনো রোগে আক্রান্ত হলেই রোগীরা ছুটে আসতেন তার চেম্বারে। দুই টাকা ভিজিট নিয়ে তার চিকিৎসাসেবা শুরু। আর এখন নিচ্ছেন সর্বোচ্চ ১০০ টাকা। কেউ ভিজিট না দিলেও তার কোনো আপত্তি নেই। আবার গরিব ও অসহায় রোগীদের ফ্রি চিকিৎসাসেবা দেন তিনি। এ ছাড়া এখন প্রতি শুক্রবার ফ্রি ক্যাম্প চালু করেছেন। মুক্তিযুদ্ধেও রয়েছে তার ব্যাপক অবদান। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রিকশায় কাপড় পেঁচিয়ে বোরকা পরে ছদ্মবেশে তিনি চিকিৎসাসেবা দিতে ছুটে যেতেন বিভিন্ন এলাকায়। এ ছাড়া তিনি নানা সামাজিক সংগঠনের সঙ্গেও জড়িত। বিভিন্ন শিক্ষা ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে বিনা ভিজিটে তিনি চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। এখন বয়সের ভারে তিনি আর কোথাও যেতে পারেন না।
তার চেম্বারে চিকিৎসা নিতে আসা ৬০ বছরের করিমন নেছা বলেন, আমরা ছোট থেকেই হাসান ডাক্তারের নাম শুনে আসছি। বড় ধরনের কোনো রোগে আক্রান্ত হলেই আমরা তার কাছে ছুটে আসি।
তার প্রায় সমবয়সী স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা হোসেন আলী সরকার বলেন, প্রতিটি গ্রামে রয়েছে তার ব্যাপক পরিচিতি। গ্রামের মানুষের একমাত্র চিকিৎসক ছিলেন তিনি। আমরা কোনো রোগে আক্রান্ত হলে ছুটে যেতাম তার কাছে। এ ছাড়া জটিল রোগীর জন্য খবর দিলেই তিনি ছুটে আসতেন গ্রামের বাড়িতে। তার নির্ধারিত কোনো ভিজিট নেই। আমরা যা দেই তাতেই তিনি খুশি থাকেন।
ডা. এম হাসান আলী খান বলেন, মানুষ আমাকে ছাড়েন না। আর আমারও বাসায় থাকতে ভালো লাগে না। তাই ছেলের কাঁধে ভর দিয়ে ছুটে আসি চেম্বারে। তিনি বলেন, রোগী দেখা তার নেশা, উপার্জনের জন্য না, তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষের চিকিৎসাসেবা করে যেতে চান। যেন মৃত্যুর পরও মানুষ তাকে মনে রাখে।
মুক্তাগাছা (ময়মনসিংহ)